Sunday, October 12, 2014

এশিয়ার প্রাচীর টপকে - ১২ (মেঘলা আকাশ)

অস্ট্রালিয়াতে পৌঁছানোর আগে কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞেস করত, বছরের কোন সময়টা আমার সবচেয়ে পছন্দের ? চোখ বন্ধ করে উত্তর দিতাম, কেন শীতকাল !! আমার দেশে বছরের বেশীরভাগ সময়ই হট অ্যান্ড হিউমিড থাকে ।। ঠান্ডার মজা আমার চেয়ে ভালো কে জানে!

কিন্তু, এই ক্যাঙারুর দেশে এসে মনে হচ্ছে, আমার এতদিনের জানাটায় ভুল ছিল ।। বাইরে যতই ঠান্ডা ঠান্ডা করে চেঁচাই আর ঠান্ডা কোক দিয়ে গলা ভিজাই না কেন, আমার ভেতরটা সবসময় খাঁখাঁ করত বৃষ্টির জন্য ।। ঢাকায় বাস করে বৃষ্টিবিলাস করাটা অবশ্য পয়লা নাম্বার আহাম্মুকি ।। ভেজা স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় থকথকে কাদা-পানি মাখা আধাপাকা রাস্তায় অর্ধেক হেঁটে আর অর্ধেক রিকশায় আধ ভেজা হয়ে অফিস করে আর যাই হোক, বৃষ্টির জন্য হাহাকার করাটা ঠিক মানাতো না ।।

দুই সপ্তাহ পর, পুত্রের স্কুল খুলেছে ।। সকাল বেলা বাসা থেকে বের হয়ে একটু থতমত খেয়ে গিয়েছিলাম ।। গত সপ্তাহ খানেক ধরে আবহাওয়া অসম্ভব গরম ।। সকাল বেলাতেই কড়া রোদের ঠেলায় ঘরের মধ্যে ঝিম ধরে বসে গরম সামলাতে হচ্ছিল ।। কিন্তু, আজ সকাল থেকে রোদের চিহ্ন নাই ।। আকাশ জুড়ে বস্তা বস্তা মেঘের স্তুপ ।। মাঝে মাঝে হালকা হাওয়া দিচ্ছে ।। কাল রাতে বৃষ্টি হওয়ায় রাস্তাঘাট মনে হয় ভেজা ।। রাস্তায় নেমেই ছেলের বিকট চিৎকার, "কী সুন্দর গাছ" ।। তাকিয়ে দেখি সত্যিই ।। গতরাতের বৃষ্টিতে গাছের পাতা গুলি অতিরিক্ত সবুজ হয় ঝলমল করছে ।।

প্রায় পনেরোদিন পর, ওয়াটসনের শুনশান নকস্ট্রীট আবারো সরগরম হয়ে উঠেছে ।। রাস্তার ফুটপাত ঘেঁষে থেমে থাকা গাড়ি থেকে মা-বাবারা বাচ্চাদের নিয়ে গাড়ি থেকে নামছে ।। ফুটপাত ধরে, সাইক্লিস্ট প্যারেন্টরা বাচ্চাদের পাশেপাশে সাইকেল নিয়ে স্কুলের দিকে যাচ্ছে ।। কোন কোন সাইকেলের পেছনে চাকা লাগানো ক্যারিয়ারে দুগ্ধপোষ্য শিশুরা বসে আছে ।। স্কুটার নিয়ে একদিল যাচ্ছে স্কুলে ।। কেউ কুকুর নিয়ে মর্নিংওয়াকটাও সেরে নিচ্ছে, বাচ্চাকে স্কুলে দেয়ার অবসরে ।। আর স্কুলে এলাকায় বাচ্চা-কাচ্চাদের চেঁচামেচি অনেক দূর থেকেও শোনা যাচ্ছে ।।

আরিয়ানকে স্কুলের আঙিনায় পৌঁছে দিয়ে ফিরতে ফিরতে বাড়ি ঘরের ফাঁক দিয়ে উঁকি মারা ভেজা-সবুজ মাজুরা পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে ভালো মনটা আরো ভালো হয়ে গেল ।। গত কয়েকদিনের শুকনো আবহাওয়ায় বেচারা কেমন জানি ম্যাড়মেড়ে হয়ে গিয়েছিল ।। মেটে রঙের পাহাড়টাকে দেখতে মোটেই ভাল লাগছিল না ।। অথচ বৃষ্টির ম্যাজিকে পাহাড়টা আজ হাজার হাজার মাইল পার করে আমাকে চিটাগাং হিলট্র্যাক্টের পার্বত্য জেলা বান্দরবানে পৌঁছে দিল ।।

বান্দরবানের প্রথম যেবার গেলাম, সেবার ঝুম বর্ষা ছিল ।। বান্দরবান শহরের প্রান্তে পাহাড়ের উপর নির্মাণাধীন মনাস্ট্রি (এখন যেটাকে স্বর্ণমন্দির বলা হয়) থেকে বর্ষার পাহাড়ের যে রূপ দেখেছিলাম, সেটা মস্তিষ্কের নিউরণে পাকাপাকি ভাবে গেঁথে গেছে।। সবুজ রঙের কত রকম শেড যে পড়েছিল, পাহাড়ের গায়ে ।। কে বলেছে, রঙধনু হতে সাতটা রঙ লাগে ? পাহাড়ের গায়ে সেদিন সবুজ রঙধনু ঝলমল করছিল বিকেলের শেষ আলোয় ।।

বৃষ্টি আরো দেখেছিলাম, সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরে ।। মাঝ হাওরে নৌকা নোঙর করে রাত কাটিয়ে ভোরে ঘুম থেকে উঠে নৌকার ছাদে ঘন্টার পর ঘন্টা আমরা চুপ করে বসেছিলাম ।। মেঘে ঢাকা আকাশ আর পায়ের নিচে টলটলায়মান জলরাশিতে কোন পার্থক্য যে সেদিন ছিল না!

অস্ট্রালিয়াতে আসার পর, মাইনাস টেম্পারেচারে রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে পুলকিত হয়েছিলাম ।। স্নো মাউন্টেনে স্কিইংয়ের গল্প শুনে শিহরিত হয়েছি ।। ফ্লোরিয়াডে বসন্ত বরণ উৎসবে মানুষের প্রাণচাঞ্চল্য প্রাণভরে উপভোগ করেছি ।। কিন্তু, ভেজা-স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ার যে রোমান্টিসিজম সেটা আগের সব অনুভূতিকে ছাপিয়ে গিয়েছে ।।

No comments: