Saturday, October 18, 2014

নিরুদ্দেশ


এবারের বাংলা নববর্ষে ঘুম থেকে উঠে এক পেট পান্তা উইথ নানান কিসিমের ভর্তা, একটা না-ইলিশ-না-জাটকা-ভাজা আর গোটা একটা পেঁয়াজ খেয়ে মনে বেজায় ফূর্তি হল ...
ফূর্তির চোটে সোজা মহাখালী বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে একটা বাসে চেপে ঢাকা-ময়মনসিংহ হাইওয়ে ধরে, গুণে গুণে একশবিশ কিলোমিটার গিয়ে মাসকান্দা স্টেশনে নেমে, করলা-ভাজি, ঘনডাল, ভাজা-শুকনা-গরুর-মাংস দিয়ে আরো এক পেট ভাত খেয়ে দম নিয়ে ভাবলাম, বাহ নিরুদ্দেশটা তো বেশী দূরে না ... আসার পর, গোটা একটা বিকাল আর সন্ধ্যা হাতে রয়ে গেছে ...
তারপর ?
একটা রিকশা নিয়ে আঁকা-বাঁকা কাঁচা মাটির রাস্তা ধরে খানিকটা পথ যাওয়ার পর, স্বাগত জানালো, বাংলাদেশ কৃষিবিশ্ববিদ্যালয়, গ্রামের ক্লাব ঘরের সামনে জমে ওঠা ছোট্ট মেলার ছোট্টছোট্ট মানুষেরা আর বিকট-ভুভুজেলা নিয়ে মোটরসাইকেলে চড়ে প্যাঁপ্যো করা না-তরুণ-না-কিশোরের দল ...
ময়মনসিংহ কৃষি-বিশ্ববিদ্যালয় জিনিসটাতে যারা যায়নি, তারা ঠিক জানে না, সেটা কি ভীষণ বিচিত্র একটা জায়গা ... তেপান্তরের মাঠের মত বিশাল কৃষিজমি, স্টেডিয়াম, বিশাল মসজিদ, নানা রকম রিসার্চ সেন্টার, ছাত্রাবাস আর একাডেমিক বিল্ডিংয়ের আশপাশ দিয়ে পিচঢালা রাস্তা ধরে যেতে যেতে মনে হবে, ঢাকার লোকগুলি রমনা পার্কের পাশ দিয়ে মাইলের পর মাইল কেন হাঁটছে, এরকম একটা স্বর্গপুরী ছেড়ে ...
নামলাম, বহুচেনা ঈশাখাঁ হলের সামনে ... বসন্তের ঝিরিঝিরি বাতাস তখনো বৈশাখের খররোদকে সবটা জায়গা ছেড়ে দেয় নি ...
হাঁটলাম, চিরচেনা রাস্তাটা ধরে - বোটানিক্যাল গার্ডেন পর্যন্ত ... দশটাকা দিয়ে টিকেট কেটে ঢুকলাম, স্মৃতির পাতা ধরে হাঁটতে হাঁটতে খুঁজলাম অনেক কিছু ... খুঁজতে খুঁজতে অবাক বিস্ময়ে আবিষ্কার করলাম, আমার প্রিয় ব্রহ্মপুত্র নদটাকে শক্ত কংক্রিটের রেলিং দিয়ে আলাদা করে দেয়া হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে ... আর ব্রহ্মপুত্রের বুকজুড়ে কচুরীপানার ছড়াছড়ি ...
পুরনো প্রেয়সীর জরাগ্রস্ত মুখটা দেখে বিষন্ন মনটাকে টেনে একটা অটো নিয়ে চলে এলাম, শম্ভুগঞ্জ ব্রিজ পর্যন্ত ... ব্রিজের পাশের ফুটপাতে দাঁড়িয়ে উবু হয়ে খুঁজলাম, আমার প্রথম যৌবনের বাঁধভাঙা উচ্ছাসের রসদ যোগাতো যে, তার ষোড়শী মুখটা ... কই ? ক্ষীণস্রোতা নদী (নদ না কিন্তু, ব্রহ্মপুত্র আমার কাছে পুরুষ নয়, নারী)-র বুক জুড়ে জমে থাকা ময়লা দীর্ঘশ্বাসই বাড়ালো ... সন্ধ্যার আকাশে জ্বলে ওঠা বছরের প্রথম পূর্ণ-চাঁদ মিটমিট করে হাসছিল আর পেছন দিয়ে শেরপুর, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জের বাস গুলি কর্কশ সুরে হাসতে হাসতে চলে যাচ্ছিল, পুরাতন-প্রেমিকের আকুতি দেখে ...
ভারাক্রান্ত মন নিয়ে, নিরুদ্দেশ যাত্রায় ইস্তফা দিয়ে, ফিরে এলাম, আপন আলয়ে ...
মধ্যরাত হতে তখনো এক ঘন্টা বাকী ...

No comments: