Saturday, October 4, 2014

এশিয়ার প্রাচীর টপকে - ৯

অস্ট্রেলিয়ান ক্যাপিটাল টেরিটরির গর্ডন এলাকায় এসে এই রাস্তা সেই রাস্তা ঘুরে বাসটা যখন জিম পাইক এভিন্যুতে ঢুকবে, তখন সীটের আশেপাশে যেকোন একটা লাল চারকোণা 'স্টপ' লেখা বাটনে চাপ দিলে 'পিং' করে একটা শব্দ করে বাসের সামনে স্টপ লেখাটা জ্বলে উঠবে ।। বাসটা থামবে একটু পরেই ।। বাস থেকে নেমে, ঝকঝকে ফুটপাথ ধরে কয়েক কদম হাঁটলে চোখে পড়বে পাহাড়ের সবুজ ঢালটা ।। কংক্রিটের রাস্তার ভেতর দিয়ে হঠাৎ মস্ত একটা সবুজ ঘাসে ছাওয়া চত্বরের ভেতর দিয়ে ফুটপাতটা একটা হেয়ারপিন টার্ন করে ওপরে উঠে গেছে ।। স্প্রিং হলে, ঘাসের কার্পেট জুড়ে "হলদে তারার ফুল"র ছড়াছড়ি থাকতো ।। কিন্তু, তখন তো শীতকাল ।। তাই কার্পেটের রঙটা সবুজই ছিল ।। সেই বাঁকানো ফুটপাতটাকে বাইপাস করে, পাহাড়টার ঢাল বেয়ে সর্টেস্ট কিন্তু স্টিপেস্ট ডিসট্যান্সে ওপর পানে উঠতে উঠতে তিনটে টু-ডাইমেনশনাল ক্যাঙারুর স্কালপচারকে পাশ কাটিয়ে এগোলে যে সড়কটাতে পা পড়বে, তার নাম ক্লেম হিল স্ট্রিট ।।

আমরা যাচ্ছি, এই রাস্তার পঁয়ত্রিশ নাম্বার বাসার দিকে ।।

যদি এখন সিয়াম-সাধনার মাস না হয়, তাহলে গল্পটা এখানেই শেষ ।।

কিন্তু, ভাগ্যক্রমে মাসটা রমজান মাসের কোন একদিন ।। সাউদার্ন হেমিস্ফিয়ারে সূর্যটা দিনের বেলা তেরছাভাবে আলো দিচ্ছে ।। অস্ট্রালিয়াতে পুরোপুরি শীতকাল ।। ক্যানবেরার পাহাড় আর ভ্যালিতে রাতের তাপমাত্রা -৫ পর্যন্ত নেমে যাচ্ছে ।।

ভোর রাতে এলার্মের শব্দে ঘুম ভেঙে যায় - সেহরীর সময়সূচক এলার্ম ।। জেটল্যাগের কারণে, ছেড়ে আসা শহরের ঘড়ির কাঁটার সাথে দেহ-ঘড়ি সিংকড হয়ে থাকার ফলে, ভোরের এলার্মের আগে একঘন্টা কি দেড়ঘন্টার ঘুম বরাদ্দ ছিল ।। সদ্যভাঙা কাঁচা ঘুম চোখে নিয়ে টলতে টলতে ঘর থেকে বেরিয়ে দরজা খুলে বাঁ দিকে মুখ ফিরিয়ে প্রশস্ত বারান্দা কাম লিভিং রুম ক্রস করে দেয়াল ঘেঁষা কাঠের সিঁড়ি বেয়ে ঠকাস ঠকাস করে নেমে শীতবুড়ির দীর্ঘশ্বাসকে সর্বাঙ্গে মেখে ধীর পায়ে হেঁটে, সুবিশাল ড্রইংরুমের একপাশের দেয়াল ঘেঁষা রুম-হিটারের সুইচে চাপ দিয়ে, বৈঠকখানা সংলগ্ন পার্টিশনবিহীন কিচেনের ফ্রিজ অথবা চুলার পাশের বাটি থেকে সেহরীর প্রয়োজনীয় রসদ সংগ্রহ করে, কিচেনটপে রেখে ধীরে ধীরে উদরপূর্তি করা হল ।। ইলেকট্রিক কেটলিতে পানি গরম করে কফি বানিয়ে মগে চুমুক দিয়ে পাশের ড্রইং রুমের আরামদায়ক সোফায় হেলান দিয়ে পা দু'টো সামনের ফুট-রেস্টে তুলে দেয়া হল ।। সেহরীর সময়টা এক সময় ফুরিয়ে গেল ।। সুবহে সাদিক আসন্ন ।। ঢাকার মত, এক মসজিদের আজানের শব্দ আরেক মসজিদের আজানকে ছাপিয়ে গেল না।। নিঃস্তব্ধ, নিঝুম রাতের ক্যানবেরা ।। কিন্তু, সামনের কাঁচের দেয়ালের ওপারে পাহাড়ের মাথায় জ্বলে থাকা ধ্রুবতারা মনে করিয়ে দিল, দিনের প্রথম লগ্নে, স্রষ্টাকে হাজিরা দেয়ার সময় গড়িয়ে যাচ্ছে ।। কিচেনের আলো, সিঁড়ির ওপরের লিভিং রুমের আলো নিভে গেল, ড্রইংরুমের হিটারের সুইচে অফ লেখা ফুটে উঠল ।। সেহরীর সঙ্গিনী সহধর্মিনী হাই তুলে চলে গেল, অতিথি-কক্ষে ।। জায়নামাজ ভাঁজ করে, ধীর কদমে, লিভিংরুমের পাশের সিঁড়ি বেয়ে নেমে এসে আগাগোড়া কাঁচের দেয়ালের ওপাশে কম্পিউটারের স্কৃণসেভারটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকার সময়, মস্তিষ্কের নিউরণগুলিতে কি অনুরণন হচ্ছিল ? কে জানে!

স্কৃণসেভারে তখন গর্ডন এলাকার নিকটবর্তী সাবার্ব আর কানেক্টিং রোডের স্ট্রিট ল্যাম্পগুলি লক্ষ লক্ষ হলদে জোনাকের আলো হয়ে জ্বলছে ।। দিগন্তের ধ্রুবতারাটা তখনো পাহাড়ের ওপাশে হারিয়ে যায়নি ।। রাতের আকাশে জমে থাকা ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘের ফাঁকে ছায়াপথের নক্ষত্রগুলিও বেশ চোখে পড়ছিল ।।

No comments: