Thursday, October 2, 2014

সূর্য উৎসব

দু'হাজার দুই সালের নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসের কথা, একযুগ হয়ে গেল প্রায় ।। বয়সটাও কম হয় নি ।। পেছন ফিরে তাকালে পৃথিবী নামের গ্রহে কাটানো অনেকগুলি বছরে জমে ওঠা অনেকগুলি সময়ের কথা মনে পড়ে ।। দিনের শেষে চোখ দু'টো বন্ধ করলে, সময় সময় ইচ্ছা করে, সময়টাকে উল্টোবাগে ঘুরিয়ে কোনএকটা বিশেষ সময়ে গিয়ে থেমে যাই ।। কেওক্রাডংয়ে সূর্য উৎসবের সময়টা সেরকমই একটা সময় ।।

মস্তিষ্কের নিউরনগুলি হাতড়ে অবশ্য সেই সময়ের কথা পুরোটা মনে পড়ে না ।। অনেক কিছুই ফিকে হয়ে গেছে সময়ের আবর্তে ।। সেই মূল্যবান সময়ের কিছু টুকরো স্মৃতি জোড়া দিয়ে সংরক্ষণ করে রাখার প্রয়াস হিসেবে এই পোস্টের অবতারণা ।। জাদুঘরে রক্ষিত ডাইনোসরের ফসিল জোড়া দিয়ে বানানো অতিকায় সরীসৃপের কঙ্কালটাই এখানে পাওয়া যাবে, কিন্তু তার রাজসিক বিচরণের চিত্রটা থাকবে লেখকের কল্পনায় ।।

বারো বছর আগের কথা ...

খবরের কাগজে, বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের আয়োজনে করা সূর্য উৎসবে অংশগ্রহণের আমন্ত্রন দেখে আব্বা আমাকে আর বড় ভাইকে বলল ঘুরে আসতে ।। এন্ট্রি ফি খুব কম ছিল না - ছাত্রদের জন্য তিন কি সাড়ে তিনহাজার টাকা ।। আর জায়গাটার নাম ছিল, কেওক্রাডং ।। বান্দরবান আর কেওক্রাডং আজ আর তরুণ-কিশোরদের মনে রোমাঞ্চ জাগায় না ।। অসংখ্য উৎসাহী ট্রেকারের বিচরণ আর সরকারী উন্নয়নের ফলে, বারো বছর আগের বুনো ছমছমে, রহস্যের হাতছানিতে ভরা বান্দরবান তার আদিম সৌন্দর্য হারিয়ে ফেলেছে বহুদিন আগেই ।। কেওক্রাডং শুনে আমার আগ্রহ হচ্ছিল না, যাবার ।। কিন্তু, নিসর্গ, প্রকৃতি আর মানুষের ব্যাপারে অত্যুৎসাহী আব্বার উৎসাহের কারণে লালমাটিয়াতে "উন্মাদ" পত্রিকার সাথে অফিস শেয়ার করা বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন"র অফিসে যেতেই হল ।।

এন্ট্রি ফি নেয়ার আগে, মিলন ভাইয়ের ভয় ধরানো লেকচার এখনো কানে বাজে ।। সারাদিন হাঁটতে হবে ।। পথে কোন খাবার পাওয়া যাবে না।। পিচ্ছিল পাহাড়ী পথ ধরে হাঁটতে গিয়ে পড়ে গেলে নির্ঘাৎ মৃত্যু ।। পাহাড়ি গ্রামে কোন টয়লেট পাওয়া যাবে না ।। রাতের অন্ধকারে বাথরুম করতে গেলে লাঠি দিয়ে শুয়োর তাড়াতে হবে ।। মশার কামড়ে ম্যালেরিয়া হলে আর রক্ষা নাই ।। মনে আছে, যাওয়ার আগের সপ্তাহে রাতে ভালো ঘুম হচ্ছিল না, মহাকাশ-মিলন ভাইয়ের কথা বার্তা মনে করে ।।

যাত্রার দিন ঘনাল ।। যাওয়ার সম্ভবতঃ আগের দিন বা কয়েকদিন আগে, বনানী ডিওএইচএস এ দলনেতা এনাম-আল-হক এর বাসায় ব্রিফিং সেশন ।। প্রকৃতি আর পাখীর ব্যাপারে অগাধ জ্ঞান সম্পন্ন চির নবীন মাঝবয়সী মানুষটার কথা সম্মোহিতের মত শুনছিলাম সেদিন রাতে ।। আলাপ হয়েছিল, অসম্ভব প্রাণোচ্ছল আর অ্যাডেভেঞ্চারপ্রিয় নানা বয়সী এক দল মানব-মানবীর সাথে; সূর্য-উৎসবে অংশ নেয়ার জন্য দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ছুটে আসা মানুষগুলি ।।

প্রচন্ড ঠান্ডার এক কুয়াশামোড়া ভোরে কমলাপুর স্টেশন থেকে আমাদের রিজার্ভ করা বাস ছাড়ল ।। বাসে ওঠার আগে, মিলন ভাই সবাইকে বিভিন্ন রঙের আইডেন্টিফিকেশন কার্ড ধরিয়ে দিল ।। একেক রঙ একেক গ্রুপের চিহ্ণ ।। আজ এতদিন পর মনে পড়ে না, আমার গ্রুপে কে কে ছিল ।। কিন্তু যাত্রার শুরু থেকেই সবাই এমন ভাবে আনন্দে আর আড্ডায় মেতে উঠেছিল যে, বোঝার উপায়ই ছিল না, এদের পরিচয় মাত্র কয়েকদিনের ।।

ডিসেম্বরের শীতের বিকালে বাস থেকে হৈহৈ করে আমরা নেমেছিলাম, বান্দরবান শহরের প্রান্তে একটা ব্রীজের সামনে ।। আমাদের রাত্রিযাপনের জন্য নির্ধারিত মিলনছড়ি হিলসাইড রিসোর্ট সেখান থেকে দু মাইলের মত চড়াই ।। এখনো কানে বাজে, মিলন ভাই তার ট্রেডমার্ক "হা হা হা" হাসি দিয়ে সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলছে, "বন্ধুরা! আমাদের কেওক্রাডং অভিযানের প্রথম ট্রেনিং এখান থেকেই শুরু হয়ে যাক ।।" যার যার ব্যাকপ্যাক কাঁধে নিয়ে তিন কিলোমিটারের মত চড়াই ডিঙিয়ে জিভ বের করে অ্যাডেভেঞ্চারপ্রিয় মানুষেরা যখন রিসোর্টে পৌঁছল, তখন রাগে একেকজনের গা জ্বলছে ।। "কোন মানে হয়, এতখানি রাস্তা হাঁটিয়ে নিয়ে আসার।। একটা জীপ তো ম্যানেজ করা যেত!"

রিগ্রিখ্যাং রেস্তোঁরা ।। হিলসাইড রিসোর্টের স্বপ্নবান মালিকের শিল্প আর ব্যবসার অসাধারণ মেলবন্ধন ।। বাংলাদেশের সবচেয়ে নৈসর্গিক এলাকা বান্দরবানের পার্বত্য সৌন্দর্য অবলোকন করার জন্য পর্যটকদের জন্য বাংলাদেশের সবচেয়ে আরাধ্য স্থান ।। আজো, এই বারো বছর পরেও আমার তাই মনে হয় ।। অবারিত আকাশ আর বুনো পাহাড়ের কোলে একটুখানি জায়গা বের করে নিয়েছে রেস্টুরেন্টের বিশাল খোলা বারান্দা ।। দরজার পাশে জালালুদ্দিন রুমীর অমর পংক্তিমালা,

"দুঃখ করো না দুটো গান ভুলে গেলে ।। কিছু হবে একতারাটা ফেলে এলে ।। আমরা এসেছি এমন গহন বনে ।। সঙ্গীতময় সবকিছু এই খানে ।। বেজে ওঠে গান, চরাচর ওঠে জেগে ।। বেতার বেহালা নিরবে চলে যে বেজে।।"

চল্লিশজনের বিশাল দলটা এই আঙিনায় এসে নিশ্চুপ হয়ে গেল ।। প্রকৃতির সাথে একাত্মতার যে কোন ভাষা হয় না !!

রিসোর্টের ছাড়াছাড়া কটেজগুলির মধ্যে আমার কপালে জুটল নির্মানাধীন একটা দোতলা ঘরের নিচতলার শয়নকক্ষ ।। সঙ্গী ছিলেন, শ্রদ্ধেয় শাহেদ ভাই আর শাহুল ।। রাতের খাবারের পর, রিসোর্টের রেস্তোঁরার সেই জাদুকরী বারান্দায় অন্ধকারে মিটিং বসল, আগামীকাল থেকে শুরু হতে যাওয়া অভিযানের ।। হিলট্র্যাক্টের টারশিয়ারী যুগের কোটিবছরের পুরনো মাটি, পাথর আর অরণ্যানীর বুক ছুঁয়ে আসা শীতের হিমেল বাতাসে জড়োসড়ো হয়ে বসে আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনলাম, এনাম ভাইয়ের দেশ-বিদেশ ভ্রমণের উপাখ্যান - বার্মার ইরাবতী নদীর পাড় জুড়ে গড়ে ওঠা গহীন অরণ্যের চেয়েও রোমাঞ্চকর নাকী এই রুমাবাজার আর কেওক্রাডংয়ের ছাব্বিশ কিলোমিটার ট্রেইল !! ( বারো বছর আগে, কেওক্রাডংয়ের বুকে পা রেখে ফিরে আসার পর এনাম ভাইয়ের কথার সাথে আমিও একমত ছিলাম ।। আজ নেই ।। মানুষের বসতি আর চাহিদার কাছে, বুনো বান্দরবান তার শ্রী হারিয়েছে বহুদিন হল)

ভোরে, অনেক ভোরে, রাতের অন্ধকার তখনো কাটেনি ।। ঘুম ভাঙল, শাহেদ ভাইয়ের ডাকে - "সালেহীন, শাহুল ওঠেন" ।। উঠলাম, টলতে টলতে ।। মিলন ভাইয়ের নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করার জন্য, রাতটা কাটিয়েছিলাম, ঘরের ঠান্ডা মেঝেতে স্লিপিং ব্যাগ বিছিয়ে - আমি আর শাহুল ।। ব্যাগ বোঁচকা প্যাকাপ করে, রিসোর্টের রেস্টুরেন্টে গিয়ে দেখি, তুমুল জটলা ।। দলের প্রায় সবাই হাজির হয়ে গেছে ।। অনেকের নাশতাও অনেক আগেই শেষ ।। বারান্দায় দাঁড়িয়ে হকচকিয়ে গেলাম ।। আমার কুড়ি বছরের জীবনে এমন দৃশ্য তো কখনো চোখে পড়ে নি ।। সামনে অবারিত সমুদ্র ।। বারান্দার সামনের যে জায়গাটা গতকাল বিকালেই ছিল, দূরদিগন্তের পাহাড় আর নিচের চপল শঙ্ক্ষ নদকে ধারণ করা এক অসীম শূন্যতা, আজ সকালে ভোজবাজির মত সেই পাহাড়, নদী, টিলা কোথায় হারিয়ে গেছে ।। সামনে শুধু সফেদ ফেনিল ঢেউরাশি - কুয়াশার সমুদ্র ।। আসল সাগরের সাথে পার্থক্য কেবল, এই জলরাশি স্থির, মৌন, নির্বাক, ঠিক নিচে লুকিয়ে থাকা ধ্যানমগ্ন পাহাড়সারির মত ।।

(চলবে)

No comments: