Sunday, November 23, 2014

এশিয়ার প্রাচীর টপকে - ২২ (ক্যাটারপিলার -> প্রজাপতি)

রোজকার মত সকালে ধবধবে সাদা বাটিতে কর্নফ্লেকস নিয়ে তার ওপর দুধ ঢেলে নাস্তা করেছিলাম ।। সাথে বাড়তি উপাদান ছিল, আগের দিন খালার বাড়ি বেড়িয়ে সংগ্রহ করা আধডজন পাকা আমের এক পিস ।। রোজকার মতই পুত্রের জুতোর ফিতায় গিঁট  বেঁধে বাসা থেকে বেরিয়েছিলাম, ঠিক ন'টা বাজার মিনিট দশেক আগে ।।

কিন্তু, রোজকার মত ছেলের সাথে আজ স্কুল পর্যন্ত যাওয়া হল না ।। বাসা থেকে বেরিয়ে পাথর বিছানো ব্যাকইয়ার্ড পেরিয়ে ডান দিকে বাঁক নিয়ে নক্সস্ট্রীটে ওঠার পর, ছেলে প্রস্তাব দিল,

"আমি একা একা স্কুলে যাই?"

স্কুলটা বাসা থেকে মিনিট চারেক দুরত্বে ।। আর মাঝখানে আরভিন স্ট্রীট ক্রস হওয়ার সময় সাবধানে গাড়ি দেখে পার হওয়া ছাড়া বিপদের আর কোন আশঙ্কা নাই ।। প্রায় চারমাস ধরে সপ্তাহে পাঁচদিন যাতায়াত করায়, পথ ভুল হওয়ার সম্ভাবনাও শূন্যের কোঠায় ।। তাই বললাম,

    "তুই রাস্তা একা পার হতে পারবি?"

ছেলে মাথা নেড়ে বলল, 

"হ্যাঁ ।। আমি পারি তো!"

     "আচ্ছা ।। কিন্তু, রাস্তা পার হওয়ার সময় গাড়ি আসছে কিনা, দেখে নিবি ।। আর দৌড় দিবি না ।। হেঁটে হেঁটে পার হবি ।।"

"কেন দৌড় দিলে কি ব্যাথা পাব?"

     "ব্যাথা পেতে পারিস ।। আবার হঠাৎ দৌড় দিলে, অন্য দিকের গাড়ি তোকে নাও দেখতে পারে ।।"

ছেলে বলল,

    "ঠিক আছে ।। তুমি তাহলে বাসায় চলে যাও ।।"

দাঁড়ালাম ফুটপাতে ।।
ছেলে দৌড়াল ।। কিছু দূর দৌড়ে রাস্তার ক্রসিংয়ে এসে থমকে দাঁড়াল ।। পেছন ফিরে হাত নাড়ল ।। ডানে বামে দেখল ।। দৌড়েই রাস্তা পেরোল ।। কিছুদূর হেঁটে আবার পেছন ফিরল ।। হাতটা নাড়ল ।। আবার দৌড়ল ।। আবার থামল ।। হাতটা নাড়ল ।। বার পাঁচেক এই চক্রের পুনরাবৃত্তি করার পর, ছয়বছুরের ছোট্ট অবয়বটা ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হয়ে আসল ।। মায়োপিয়ায় আক্রান্ত চোখের সাহায্যকারী চশমাও মাজুরা প্রাইমারীর আর দশটা ছেলেমেয়ের থেকে আমার ছেলেটাকে আলাদা করে চেনাতে পারল না ।। শুধু কাঁধের হালকা কলাপাতা সবুজ রঙের, হাস্যমুখী টাইরানোসরাসের মুখ আঁকা ব্যাগটা দেখে বোঝা যাচ্ছিল, সৈয়দ তাইসির আলম, মাজুরা প্রাইমারীর স্কুলের কোয়ার্টজ ক্রিস্টাল শাখার নবতম শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে পাঠ নিতে যাচ্ছে ।।

বাসায় ফিরে মনে করার চেষ্টা করলাম, জীবনে কখনো কি বাপ আর ছেলে প্রায় একশ মিটার দুরত্বে থেকে একজন আরেকজনকে হাত নেড়ে বিদায় জানিয়েছি ?

মনে পড়ল বেশ কয়েক বছর আগে, দার্জিলিং-সিকিমে সিঙ্গালিলা রিজ ট্রেকে যাওয়ার আগে, ফকিরাপুল বাস স্টেশনে ছেলে আর ছেলের মা'কে বিদায় জানিয়ে বাস উঠেছিলাম ।। মনে পড়ল, অফিসের ট্রিপে টেকনাফ-সেন্টমার্টিনে যাওয়ার সময়, ছেলেকে বাসা থেকে বিদায় জানিয়ে পথে নেমেছিলাম ।।

কিন্তু, সম্ভবতঃ এই প্রথম আরিয়ান আমাকে বিদায় জানিয়ে নিজের পথে নিজে হাঁটল!

2 comments:

iamacgyver said...

দারুন! কেমন ভালো লাগলো আবার মন খারাপ করে দিলে।

Salehein said...

থ্যাঙ্কিউ তপু ভাই :)