Thursday, January 1, 2015

এশিয়ার প্রাচীর টপকে (সাউথ-প্যাসিফিকে বর্ষবরণ)

সিডনী হারবারের ইস্ট সার্কুলার কীতে ঢুকে আমরা লাইনে দাঁড়ালাম ।। বাঁয়ে সমুদ্র আর হারবার ব্রিজ ।। সামনেই কোথাও সিডনী অপেরা হাউজ ।। চামড়া ঝলসানো গরম ।। লম্বা লাইন ধীর গতিতে এগোচ্ছে ।। কিউয়ের শেষ প্রান্তে ব্যাগ চেক করে অপেরা হাউজ এলাকায় ঢোকানো হচ্ছে পর্যটকদের ।। শতশত, হাজার হাজার, নাকি লাখ-লাখ পর্যটক, কে জানে! পৃথিবীর প্রায় সমস্ত রঙের মানুষকে দেখছি চারিদিকে ।। অপেক্ষার প্রহর শেষে, ব্যাগ দেখিয়ে আমরা ঢোকার অনুমতি পেলাম ।। সিডনী শহরের অল্প কিছু ভাগ্যবান (?) মানুষদের সাথে শামিল হয়ে (যারা রাতের আলোর বন্যা সবচেয়ে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পাবে, হারবার ব্রীজ আর অপেরা হাউজের (প্রায়) নিকটতম দূরত্বে থেকে ) আমরা অপেরা হাউজ এলাকায় প্রবেশ করলাম ।। সামনে পেছনে ডাইনে বাঁয়ে চাদর বিছিয়ে, চেয়ার পেতে, খালি মেঝেতে অগণিত মানুষ জায়গা খুঁজে নিয়েছে, আগামী বারো ঘন্টার জন্য ।। আমরা এদিক সেদিক ঘুরে দু’টো ময়লা ফেলার বিন আর একজন ইউরোপীয় ললনার মাঝখানে এক চিলতে জায়গা পেলাম, পেছনে চমৎকার ফেন্সিং সহ ।। চাদর পেতে, ব্যাগ, স্ন্যাক্সস, পানির বোতল একপাশে রেখে দু’টো ছাতা মেলে বসলাম রোদ থেকে হাত, পা, পিঠ, ঘাড়, মাথা বাঁচাতে ।। আমাদের সামনেই চাদর পেতে বড় একটা ভারতীয় পরিবার বসেছে, বাঁয়ের ককেশীয় সুন্দরীর পরেই একটা পূর্ব এশীয় কিংবা, চীনা পরিবার মাথার ওপর চাদরের ছাউনি দিয়ে কাচ্চা-বাচ্চা সহ বসেছে ।। ডানদিকের বিন দু’টোর ওপাশেও চ্যাপ্টানাকের হলদে বর্ণের চার জনের যুবক-যুবতীর দল ।। সামনে টিকেট বুথের বক্সে হেলান দিয়ে চীনা বা ঐ অঞ্চলের একটা কাপল আর বেশ কিছু হলদে মানুষ ।। মানুষের মেলা ।। জুতা-মোজা খুলে বসে নিউ সাউথ ওয়েলসের সামারের আঠাশ ডিগ্রির গরমে শরীরকে ধাতস্থ হবার সুযোগ দিয়ে চোখ আর মাথা ঘুরিয়ে আমাদের অর্ধদিবসের প্রতিবেশীদের চেহারা গুলি দেখে নিলাম ।। আমাদের বাঁপাশের দীর্ঘাঙ্গিনী সুন্দরীকে আপাদমস্তক দেখে নিজের পোশাকের দিকে তাকিয়ে একটু আফসোস হল ।। বসুন্ধরার ট্রেন্ডজ থেকে কেনা কালো ট্রাউজার, গুলশানের স্পার্ক গীয়ারের স্ট্রাইপড টিশার্ট, অ্যাপেক্সের জুতা-মোজা আর নিউমার্কেটের ধূসর টুপিতে অস্ট্রালিয়ায় অনাহারে-অর্ধাহারে (!) থাকা স্লিম শরীরটা নেদারল্যান্ডের ইউনিভার্সিটির শেষ বর্ষে পড়ুয়া অস্ট্রালিয়ায় ওয়ার্ক-স্টুডেন্ট ভিসায় বেড়াতে আসা স্বল্পবসনা, সানস্ক্রীম মাখানো শুভ্র-তামাটে-লালচে বর্ণের লম্বা চওড়া অবয়ব আর কালচে-সোনালী চুলের অধিকারিণীর পাশে বড়ই বেমানান ।। আর বউ আর ছয়বছরের পুত্রকে পাশে নিয়ে হারবার ব্রীজকে সাক্ষী রেখে এসব পাপ চিন্তা মনে আনাটাও বোকামি ।। তাই বড় করে একটা নিঃশ্বাস ফেলে পকেটে গোটা আশি ডলার সম্বল করে বের হলাম, দুপুরের খাবার সংগ্রহের আশায় ।। মানুষের মেলার ভেতর দিয়ে পথ খুঁজে খুঁজে আর খাবারের বাক্স হাতে মানুষের চলার পথ লক্ষ্য করে করে অপেরা হাউজের এক পাশে লম্বা টানা খাবারের ছাউনিটা খুঁজে পেতে কষ্ট হল না ।। ফুডকোর্টের সামনে আঁকাবাঁকা রেলিং ঘেরা পথে লাইনে দাঁড়িয়ে এখানে সেখানে টানিয়ে রাখা খাবারের মেনুতে চোখ বুলিয়ে নিলাম ।। স্যান্ডউইচ, সালাদ, ব্রাউনি, বার্গারের লিস্টের একদম ওপরের দিকের উড-ফায়ার পিৎজাটা মনে ধরল ।। উনিশ ডলারের ধাক্কা ।। সামনের সুট-কোট পড়া বাঙালি ভদ্রলোককে আড়চোখে ঠাহর করতে করতে লিস্ট থেকে আমাদের দুপুরের খাবার (পর্ক/হ্যাম ছাড়া, পেপেরনি, টমাটো দেয়া পিৎজা) ঠিক করে নিলাম ।। সেলসের ব্যস্ত তরুণ-তরুণীরা অসম্ভব দক্ষতার সাথে দ্রুতগতিতে সবাইকে খাবার সার্ভ করছে ।। খাবারের বাক্স এক হাতে আর পুত্রকে অন্য হাতে ধরে ভীড় ঠেলে এগিয়ে আমাদের অস্থায়ী রিফ্যুজি (!) ক্যাম্পে হাজির হলাম ।। বউ আর ছেলের হাতে খাবারের বাক্স ধরিয়ে আবার বেরুলাম, মানুষ দেখতে আর খাবার পানির সন্ধানে ।। চারিদিকে অসি সিকিউরিটি আর নিউ-ইয়ার-ইভের আয়োজনের দায়িত্বে থাকা মানুষগুলি তৎপর হয়ে সিডনীর মেহমানদের দেখাশোনায় ব্যস্ত ।। ঘুরে ফিরে, বাথরুমের কল থেকে পানির বোতল ভরে ফিরে পিৎজার বাক্সে দু’টুকরো পিৎজা আর ছেলে-বউয়ের না-খাওয়া পিৎজা-ক্রাস্টের অংশবিশেষ পেলাম।। আয়েশ করে চিবোতে চিবোতে দেখি আমাদের সামনের ভারতীয় পরিবার বাড়ি থেকে আনা বাক্স থেকে বিরিয়ানী বের করে মন দিয়ে খাচ্ছে, গাজরের টূকরোয় কামড় বসাতে বসাতে ।। লাঞ্চ সেরে ছাতার নিচে গুটিসুটি মেরে বসে রোদ থেকে নিজেদের বাঁচাতে মগ্ন হলাম ।। আড়চোখে দেখি, আমাদের পাশের ডাচ-সুন্দরী নির্ভাবনায় কালো-কাপড়ের আবরণে নিজেকে আংশিক ঢেকে, মসৃণ পিঠ আর আর ... ... না থাক ( :P ) সূর্যের হাতে সঁপে দিয়ে চোখ বুঁজে কে জানে, কী স্বপ্ন দেখায় মগ্ন! কালো ট্রাউজার অর্ধেক তুলে, ছাতা এপাশ ওপাশ নানা কিছু করে যখন কিছুতেই সূর্য থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারলাম না, তখন আবার পায়ে মোজা জুতো গলিয়ে বেরোলাম, একটু বাতাসের সন্ধানে ।। ছেলের হাত ধরে, ফুডকোর্ট ছাড়িয়ে, অপেরা হাউজের ডানপাশে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে সমুদ্রের নোনা বাতাসে প্রাণভরে শ্বাস নিলাম ।। সামনে খোলা সমুদ্রের বাঁকে অজস্র রাজহাঁসের মত অজি-জাহাজ, স্পীডবোট আর ফেরী সাগরে বিচরণ করছে ।। মাঝে মাঝে রঙধনুর ঝলক দিয়ে এক ঝাঁক লাল, নীল, হলুদ, সবুজ জলযানও ঘোরাফেরা করছে ।। অপেরা হাউজের ওপর তলার বিশাল চত্ত্বরে মানুষের ভীড় তুলনামূলক ভাবে কম ।। বাচ্চাদের সংখ্যাই এখানে বেশী – ইচ্ছেমত লাফাচ্ছে-ঝাঁপাচ্ছে আর প্যাসিফিক ওশানের জলো বাতাসে মন ভরে শ্বাস নিচ্ছে ।। কোন কোন কাপল আর সিঙ্গেল সেলফি তোলায় ব্যস্ত ।। ওয়েস্টার্ন অস্ট্রালিয়া থেকে ফূর্তি করতে আসা জ্যাকের কাছ থেকে পৃথিবীর নারীকূলকে নিয়ে তার খেদের কথা শুনলাম মন দিয়ে ।। তার মিনিট খানেকের বক্তব্যের সারমর্ম হল, “ফেরারী গাড়ি ছাড়া মেয়েদের মন পাওয়া বেশ কষ্ট”, আর “মেয়েদের (বিশেষ করে ইউরোপীয় ললনাদের) চোখ নাকি, সঙ্গীর হৃদয়ের চেয়ে ক্রেডিটকার্ডের দিকেই বেশী থাকে” ।। মনটা খারাপই হয়ে গেল ।। একটা ফেরারী গাড়ি আর একটা ক্রেডিট কার্ডের অভাবে জগতের কত নির্মল আনন্দ থেকে যে বঞ্চিত হচ্ছি !! নিচে নামলাম ছেলেকে বাথরুম করাতে ।। অপেরাহাউজের নিচে প্রবেশদ্বার আর কার পার্কিং এলাকায় বিশাল এলাকা জুড়ে টেম্পোরারি ইউনিসেক্স টয়লেট আর মেন’স ইউরিনাল ।। শতশত মানুষ কিউতে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে, নিজেদের সুযোগ আসার অপেক্ষায় ।। করিৎকর্মা, সবুজ জ্যাকেট পড়া অজি-ক্লিনাররা ভিজিটরদের ব্যবহারের পর টয়লেটের দরজা খুলে হাসিমুখে মপ দিয়ে মেঝে আর টিস্যুপেপার পরিষ্কার করছে পরের অতিথির জন্য পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে ।। পরের ঘন্টা খানেক কাটল, আমাদের অস্থায়ী ক্যাম্প আর অপেরার ওপর তলায় আসা-যাওয়া করে ।। আকাশে বিমানের কসরৎ, লাল হেলিকপ্টারের ওড়াউড়ি, সাগরে সফেদ জলযানের বিচরণ, চলন্ত ফেরীর ছাদে বসা এক আদিবাসী মানুষের নতুন বর্ষের শুভেচ্ছা বিনিময় আর অসংখ্য পৃথিবীবাসীর সান্নিধ্যে দুপুর গড়িয়ে বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা হয় হয় হল ।। গুটিকয়েক বাঙালির ভীড়ে একজন বেড়াতে আসা বাংলাদেশিনীর সাথে কথা হল ।। অজি-দেশ নিয়ে মুগ্ধতা আর কুশল বিনিময় করে যখন শেষবারের মত আমাদের ছাউনিতে ফিরলাম, তখন সন্ধ্যা নেমে গেছে ।। ওয়াইন, বিয়ার, মদিরার ঘ্রাণ, প্রশান্ত মহাসাগরের হাওয়া, আকাশে আধখানা চাঁদ, মেঘের সাথে লুকোচুরি খেলা তারার মেলা আর অপেরা বারের কনসার্টের শব্দে চরাচর ভেসে যাচ্ছে ।। চীনা, ইউরোপীয়, আরব, ভারতীয়, পূর্ব-এশীয়, আফ্রিকীয়, শিশু, বৃদ্ধ, তরুণ, তরুণী, কাপল, সিঙ্গেল, ফ্যামিলি - সবার প্রাণে তখন প্যাসিফিক ওশানের হাওয়ায় পশ্চিমা বর্ষবরণ উৎসবের আমেজ ভর করেছে ।।
শেষ কথা -
সৈয়দ মুজতবা আলীর বইতে পাওয়া একটা গল্প দিয়ে শেষ করি ।। এক গ্রামের চাষীরা একজন নিষ্কর্মাকে প্রতি মাসে মাসোহারা দিত, তাদের গল্প শোনাবার জন্য ।। সারাদিনের কাজ সেরে ক্লান্ত কৃষকের দল গাছ তলায় গোল হয়ে গল্প-কথককে ঘিরে বসত নানান আজব গল্প শোনার আশায় ।। সে-ও প্রতিসন্ধ্যায় মনের মাধুরী মিশিয়ে আজগুবি সব গল্প বলে গ্রামবাসীর মন ভোলাতো ।। গল্পের একটা নমুনা – “বুঝলে, কাল রাতে গাছ তলায় শুয়ে আছি ।। হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে গেল ।। চোখ মেলে দেখি, গাছের কোটর থেকে একদল বনপরী বেরিয়ে পুর্ণিমার আলোয় নাচতে নাচতে হাওয়ায় ভেসে ভেসে নদীর ধারে চলে গেল ।। সেখানে নদী থেকে উঠে এলো একদল জলপরী ।। তারপর সে কী নাচ আর গান !! আমি গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে মন ভরে দেখলাম তাদের অপরূপ নৃত্য আর গীত ।। তারপর চাঁদ ডুবে গেলে তারা বাতাসে মিলিয়ে গেল ।।“
তারপর, একদিন রাতে সে গাছের নিচে ঘুমাচ্ছিল ।। গভীর রাতে তার ঘুমটা ভেঙে গেল ।। আকাশে পূর্ণিমা না, অর্ধেক চাঁদ ছিল ।। আধখাওয়া চাঁদের ঘোলাটে আলোয় সত্যি সত্যি বন থেকে সবুজ ডানার একদল পরী বেরিয়ে এল ।। তারা হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে নদীর দিকে ঠিকই গেল ।। নদী থেকে ঠিকই একদল জলপরী উঠে এল, ঠিক তার গল্পের মত ।। তারপর, সবই হল - নাচ হল, গান হল, চাঁদ ডুবে গেলে পরীরা বাতাসে মিলিয়েও গেল ।। আর পরদিন সন্ধ্যায় চাষীরা গাছের নিচে গোল হয়ে বসলে, গল্প কথক রেগেমেগে বলল, “কাল রাতে আমি কিচ্ছু দেখিনি !! কিচ্ছু না!!”

অপেরা হাউজ থেকে রাত সোয়া বারোটায় হাজার মানুষের মিছিলে শামিল হয়ে সেন্ট জেমস স্টেশনের দিকে যাওয়ার পথে, ডাচ সুন্দরীর মা যখন কোথা থেকে হাজির হয়ে আমার আর আমার বউয়ের একটা ছবি তুলে দিয়ে রাতের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল - তখন আমার বলতে ইচ্ছা হচ্ছিল ।। নাহ, মুজতবা আলীর গল্পের কথকের মত আমি “কিছু দেখি নি” বলব না ।। কিন্তু বিশ্বাস কর, আমি ফায়ার-ওয়ার্ক্সের আলোর বন্যায় ভেসে যাওয়া হারবার ব্রীজের সামনে দিয়ে ভেসে বেড়ানো রূপকথার ময়ুরপঙ্খী নাওয়ের মত আলোর জাহাজ, রাতের অন্ধকারে দক্ষিণ গোলার্ধের আকাশে লুকোচুরি খেলা অর্ধেক চাঁদ, মেঘ আর তারাকে লজ্জায় ফেলে দেয়া আতশবাজির আলোয় উদ্ভাসিত আকাশকেও দেখিনি ।। আমি শুধু মানুষ দেখেছি ।। আমি দু’চোখ ভরে পৃথিবীবাসীদেরকে দেখেছি সেই রাতে ।।

No comments: