Saturday, November 8, 2014

এশিয়ার প্রাচীর টপকে - ১৮ (এক ডলারের সওদা)

আবহাওয়ার পূর্বাভাসে আজকের তাপমাত্রা ত্রিশ ডিগ্রিতে ওঠার কথা ।। দুপুর দু'টায় বাইরের খটখটে রোদ দেখে মনে হল, ত্রিশ তো ত্রিশ, টেম্পারেচার বত্রিশ/চৌত্রিশ উঠে যাওয়াও অসম্ভব না ।। তাও ছেলের মাথায় ক্যাপ চাপিয়ে নিজে একটা ক্যাপ মাথায় দিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে ফুটপাত ধরে উত্তর মুখো হয়ে হাঁটা দিলাম ।। গন্তব্য, মাজুরা প্রাইমারী স্কুল ।।

গত প্রায় এক মাস ধরে স্কুলের সামনের বিশাল নোটিশ বোর্ডে আর বাসায় পাঠানো নিউজলেটারে পইপই করে মনে করিয়ে দেয়া হয়েছে, আটই নভেম্বর বেলা বারোটা থেকে চারটা পর্যন্ত অনুষ্ঠিতব্য স্প্রিং কার্নিভালের কথা ।।

খরখরে শুকনো আবহাওয়ায় আর চড়চড়ে রোদ হাফশার্টের ভেতরে গা টা চিড়বিড় করতে লাগল ।। জনবিরল নক্স স্ট্রীটের দুধারে রাস্তার উপর পার্ক করা গাড়ির সংখ্যা গুনে বুঝলাম, কার্নিভাল জমে উঠেছে ।। উলটো দিক থেকে দেখি, তিন বৃদ্ধা আসছেন, লাঠি ভর দিয়ে ।। হাসি মুখে কুশল বিনিময় করতে করতে পা চালালাম ।। আরেকটু এগোতেই চোখে পড়ল, আমাদের ভূটানী বন্ধু কিনলে, রঙিন ছাতা মাথায় তার বৌকে নিয়ে ফিরছে ।। দু'টো কথা কয়ে পা চালালাম আবার ।।

আরভিন স্ট্রীটের ক্রসিংয়ের অন্য পাশ থেকেই দেখতে পারলাম, স্কুল প্রাঙ্গনে বাচ্চাদের খেলার জায়গায় বেজায় ভীড়।। স্কুলের ফিক্সড রাইড গুলোর ফাঁকে চোখে পড়ল, নতুন বসানো কালারফুল পোর্টেবল জাম্পিং কাসল ।। তার আশে পাশে ছোট খাটো আরো কিছু খেলার সামগ্রী ।। আমাদের আফগান প্রতিবেশিনী সাফিয়া আমার পুত্রকে হাসিমুখে গ্রিট করল ।। জিজ্ঞেস করে জানলাম, সে সে-ই সকাল এগারোটা থেকে তিন ছেলেমেয়েকে নিয়ে এখানে আছে ।। স্কুলের ভেতরের বড় হলরুমে নাকি বিশাল বাজার বসেছে ।। নানা রকম কাপড়, টি-শার্ট, বাচ্চাদের খেলনা, ব্যাগ, আরো হাবিজাবি নানান জিনিস নাকি সেখানে বিক্রি হচ্ছে আর খুবই সস্তায় ।। ভাবলাম, পঁচাত্তর দিয়ে গুণ করে জিনিস কেনার দেশে শস্তা আর কত হবে !!

এক পাশে ক্ষুদে একটা পেট-চিড়িয়াখানা বসেছে ।। ভেড়া ছাগল শূকর খরগোশ দেখে অবাক হই নি ।। কিন্তু, আস্ত একটা লোম ফোলানো লামার বাচ্চা দেখে তাজ্জব হয়ে গেলাম ।। প্রশান্ত মহাসাগরের ওপারের দক্ষিণ আমেরিকা থেকে লামা ব্যাটা কীভাবে হাজির হল !

নীল রাবারের ফোলানো চৌবাচ্চায় পানি জমিয়ে তার মধ্যে প্লাস্টিকের বল আর রাবারের হাঁস ছেড়ে দিয়ে বাচ্চাদের জন্য দুর্দান্ত একটা খেলার জায়গা বানিয়ে বসে আছেন এক ভদ্রলোক ।। প্লাস্টিকের পাম্প দিয়ে পানি ছোঁড়ার ব্যবস্থা আছে ।। প্রথম কিছুক্ষণ, বাচ্চাগুলি ভদ্রভাবে পানি দিয়ে খেলছিলো ।। কিছুক্ষণ পর, যখন আবিষ্কার হল, পানি অনেক দূরে মারা যায়, তখন নরক গুলজার হয়ে গেল ।। পানিতে চুপচুপে ভেজা ছেলেকে ঘন্টা খানেক পর তুলে মা'র আনা শুকনো জামাকাপড় বদলে দিয়ে ভাবলাম, সাফিয়ার কথা মত, ভেতরে বাজারটা ঘুরে আসি ।।

হলরুমে এলাহী কারবার ।। দুনিয়ার পুরানো জিনিস দিয়ে ভরে ফেলেছে ।। এক পাশ থেকে দেখা শুরু করলাম ।। ব্যাডমিন্টন র‍্যাকেট, গলফ খেলার পুরনো লাঠি, একটা প্রায় নতুন ছাতা, পুরনো টেনিস বল, সাইকেলের হেলমেট, লাইফজ্যাকেট আর গাদা গাদা বাচ্চাদের পুরনো, নতুন, ভাঙা, আস্ত খেলনা ।। কিছুক্ষণ পর, একজন মানুষ চিৎকার করে ঘোষণা দিল, "ওয়ান ডলার ফর আ বক্স" ।। মানে কী রে বাবা! এক ডলার দিয়ে বাক্স কিনবো কেন?! ঘুরছি ফিরছি দেখছি ।। এমন সময় আমাদের ইন্দোনেশিয়ান প্রতিবেশীর পুত্র রাফা এসে খবর দিলো ।। সে এক সেট হাতের প্যাড (কিসের প্যাড কে জানে!) বিশ সেন্ট দিয়ে কিনেছে ।। এত শস্তায় জিনিস্ কিনে সে মহাখুশী ।। একটা পঞ্চাশ সেন্ট হাতে নিয়ে ঘুরছে আরো কিছু কেনার জন্য ।। মাথা নেড়ে এগোলাম ।। সার বেঁধে ব্যাগ রাখা ।। বেশীরভাগই ল্যাপটপ রাখার পুরনো ব্যাগ ।। তার মধ্যে ঝলমলে গাড়ির থিমের একটা ট্রলি ব্যাগে আরিয়ানের চোখ পড়ে গেল ।। পুরনো হলেও জিনিসটা ঠিক আছে ।। "বাবা এটাতে আমার খেলনা রাখবো" ।। তথাস্তু ।। পাশেই পাজল সাজিয়ে রাখা টেবিলের ওপারের মহিলাকে জিজ্ঞেস করলাম, ব্যাগটার কত দাম হতে পারে ।। সে আমার চোখ কপালে তুলে জবাব দিল, ব্যাগটার মধ্যে যা ইচ্ছা তাই ভরে নাও ।। সবমিলিয়ে এক ডলার দিতে হবে ।।

তারপর ?

বাড়ি ফিরলাম, তিনজোড়া বাচ্চার জুতা/স্যান্ডেল, একসেট বাচ্চাদের নাইটড্রেস একটা পোকামাকড়ের বই-পোস্টার সেট, একটা পাজল, তিনটা সফট টয়, একটা কয়েন বক্স, একটা দেয়ালে ঝোলানোর খেলনা আর সেই গাড়ির থিমের চমৎকার ট্রলি ব্যাগটা নিয়ে ।। খরচ হল দু'টো ডলার ।। একটা আমাদের ব্যাগ ভর্তি জিনিসের জন্য ।। আরেকটা রাফার জিনিস ভর্তি বাক্সের জন্য ।।










No comments: