উলওয়ার্থের ব্যাগে টুকিটাকি জিনিসপত্র নিয়ে এক মাঝবয়সী ঈষৎ ভুঁড়ি ওয়ালা, মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি আর ঢলঢলে প্যান্ট পরা একজন হোয়াইট অসি ভদ্রলোক হাজির হয়ে জিভ জড়ানো কন্ঠে জানতে চাইল, আমি থার্টি নাইন নাম্বার বাসের জন্য অপেক্ষা করছি কীনা ।। হ্যাঁ বলাতে মাথা নেড়ে পাশে দাঁড়িয়ে জানতে চাইল, বাস আসতে দেরী হবে নাকী! বললাম, "না এতক্ষণে তো চলে আসার কথা" ।। জিজ্ঞাসিলাম, সে ওয়াটসনে যাবে নাকি? বলল, সে কাছেই নামবে - ডাউনার স্ট্রীট ।। আলাপের সূত্র ধরে আলাপ জমে উঠল ।। জানতে চাইল, আমি কোথায় থাকি ? - "ওয়াটসন" ।। "সরকারী ফ্ল্যাট না প্রাইভেট" ? ক্যানবেরায় সরকারী ফ্ল্যাটের ব্যাপার আছে, জানতাম না ।। মাথা নেড়ে বললাম, প্রাইভেট ইউনিট ।। একটা ফ্ল্যাটের নাম করে বলল, ওখানে থাকি কিনা ।। বললাম, "না ।। অন্য জায়গায়, নক্স স্ট্রীট-কালেনস্ট্রীটের ইন্টারসেকসনে ।।" মাথা নেড়ে বলল, আমি সরকারী ফ্ল্যাটে থাকি ।। জানতে চাইল, এখানে কি অনেকদিন আছি কীনা ।। - "বেশী দিন না, পাঁচ মাস হবে ।।" বৌয়ের পিএইচডির কথা শুনে চোখ কপালে তুলে বলল, বল কী! পিএইচডি করছে?! বাড়ি বাংলাদেশ শুনে বলল, সে একটা বাচ্চা মেয়েকে পাঁচ বছর ধরে স্পনসর করেছে, সেভ দ্য চিল্ড্রেনের আন্ডারে ।। সম্ভবতঃ ইথিওপিয়ার অথবা, বাংলাদেশের ।। তারা তাকে মেয়েটার ছবি পাঠায়, কেমন আছে জানায় ।। সে খুব খুশী কাজটা করে - মাসে সামান্য কিছু ডলার খরচ করে একটা বাচ্চাকে সাহায্য করতে পেরে ।। কন্ঠে জোর এনে হাসিমুখে বলল, "সে-ভ দ্য চিল্ড্রেন" ।। হেসে তাকে অভিনন্দন জানালাম ।। জানতে চাইল, আমার ছেলেমেয়ে আছে কীনা! এক ছেলে স্কুলে পরে শুনে মাথা নেড়ে বলল, তার দুই ছেলেমেয়ে ।। ছেলেটা বড়, চব্বিশ বছর বয়স, কাজ খুঁজছে ।। শুধালাম, সে কি গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেছে ।। মাথা নেড়ে বলল, না কলেজ পর্যন্ত পড়েছে ।। অবাক হয়ে বললাম, কিন্তু, অস্ট্রালিয়ান গভর্নমেন্ট তো ছেলেমেয়েদের প্রায়-বিনাবেতনে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ দেয় ।। সে চোখ মুখ কুঁচকে বলল, হ্যাঁ কিন্তু আমার ছেলের কাছে পড়াশোনা খুব কঠিন লাগে ।। বারো ক্লাস পর্যন্ত পড়লে ইউনিভার্সিটিতে যেতে পারত ।। সে পড়েছে এগারো ক্লাস পর্যন্ত ।। আর কলেজের পড়া যা কঠিন !! বুঝলাম, ছেলের পড়াশোনার দুঃখে সেও সহমর্মী ।। হেসে বলল, তোমার বৌ তো পিএইচডি করছে ।। আমিও হাসলাম, "হ্যাঁ, তার পড়াশোনা করতে খুব ভালো লাগে ।।"
প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে জানালো, সে আর্মিতে কুকের সার্ভিস করত ।। ইঙ্গলবার্ন আর ক্যানবেরার একটা জায়গায় ছিল, পঁচাত্তর থেকে তিরাশি পর্যন্ত ।। ওয়ারে অবশ্য কখনো যায় নি ।। অসুস্থতার জন্যে, আর্লি অবসর নিয়েছে, কিন্তু এখন পেনশন পাচ্ছে নিয়মিত ।। অসুস্থতার কথা আর জিজ্ঞেস করলাম না ।। এর মধ্যে বাস আসতে দেখে, হাত বাড়িয়ে জানালো, "তোমার সাথে আলাপ করে খুব ভালো লেগেছে ।।" বাড়ানো হাতটা ধরে, নিজের নামটা বললাম ।। উত্তরে বলল, "আমি গ্যারী" ।।
বাসে উঠে পেছনের সীটে চলে গেল ।। দু'টো টার্ন নেয়ার পরে একটা স্টপেজে হন্তদন্ত হয়ে নেমে গেল গ্যারী ।। নামার আগে পেছনে তাকিয়ে হেসে হাতটা নাড়ল ।। হাতটা ওয়েভ করে বিদায় জানালাম ।। নীলসবুজ অ্যাকশন বাসটা হাসিমুখের গ্যারীকে ক্যানবেরার শহরতলির ফুটপাতে একা রেখে আমাকে বাড়ি পৌঁছে দিল ।।
No comments:
Post a Comment