আজকের জমানা হল, তথ্যের জমানা ।। আমাদের ঘিরে আছে নানান অজস্র বিচিত্র তথ্যের সম্ভার ।। আর বছর-বছর তথ্যের পরিমাণ বেড়ে চলেছে ... বেড়েই চলেছে ।। আমাদের মানবপ্রজাতির জ্ঞানের, প্রকৃতিকে অনুধাবণের বিনিময়যোগ্য মুদ্রা হচ্ছে এই তথ্য তথা ইনফরমেশন ।। জটিল আর বিচিত্র মহাজগতের ভুবনে আমাদের গতিবিধির দিকনির্দেশনা দেয় তথ্য ।। কিনতু, প্রশ্ন হল, "তথ্য" আসলে কি?
বছরের পর বছর এই প্রশ্নের আবর্তে ঘুরপাক খেতে খেতে অবশেষে আমরা বুঝতে শিখছি যে, যে তথ্যকে এতকাল একটা বিমূর্ত-অ্যাবস্ট্রাক্ট ধারণা বলে আমরা ধরে নিয়েছিলাম, তা আসলে সত্যি নয় ।। তথ্য কেবল মাত্র কোন একটা ধারণাকে প্রকাশ করা আর কম্পিউটারের বাইনারী মেমোরীতে জমিয়ে রাখা শূন্য-এক এর সিকোয়েন্স নয় ।। বরং, তথ্য একটা নিরেট বাস্তব, ফিজিক্যাল এন্টিটি, পদার্থবিজ্ঞানের বসতু আর শক্তির মতই ধরাছোঁয়া আর পরিমাপের যোগ্য একটা বিষয় ।। যন্ত্রের কাজ করা আর জীবন্ত বসতুর ক্রিয়াকলাপ - সবখানেই বিমূর্ত(!) তথ্যের বড় ভূমিকা রয়েছে ।।
অতি সম্প্রতি একটা চাঞ্চল্যকর পরীক্ষা করা হয়েছে ।। শুধুমাত্র তথ্য দিয়ে চালিত একটা ক্ষুদে যন্ত্র ধাতুকে ঠান্ডা করে ফেলেছে ! এই জাদুকরী মেশিনটা আমাদেরকে নতুন জগতের সন্ধান দিতে পারে, যেখানে অসম্ভব এফিশিয়েন্ট ন্যানো স্কেল মেশিন তৈরি করা কোন ব্যাপারই হবে না, জীবনের প্রবহমানতা সম্পর্কে নিত্যনতুন ধারণা পাওয়া যাবে আর পার্থিব জগতের মৌলিক তত্বগুলি সম্পর্কে আগের চেয়ে অনেক পরিষ্কার ধারণাও হয়ত পাওয়া সম্ভব হবে ।।
একেবারে গোড়া থেকে শুরু করলে বলা যায়, ইনফরমেশন একটা অন্তহীন রহস্যের আধার যার সাথে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ আছে, থার্মোডিনামিক্সের ।। তাপগতিবিদ্যার দুর্ভেদ্য কিছু ল' আছে, যা ব্যাখ্যা করে, কিভাবে তাপশক্তিকে শক্তির অন্যান্য ফর্মে রুপান্তরিত করা যায় ।। পদার্থবিজ্ঞানের অনেক জটিল জটিল প্রক্রিয়াকেও তাপগতিবিদ্যা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় ।।
অণুপরমাণুর এলোমেলো গতিবিধি দিয়ে ব্যাখ্যা করা তাপশক্তির সাথে ওয়ার্ক - অর্থাৎ, "এনার্জিকে কোন একটা বিশেষ কাজে ব্যবহার করা"র মধ্যে সুনির্দিষ্ট পার্থক্য গড়ে দিয়েছে, থার্মোডিনামিক্স তথা তাপগতিবিদ্যা ।। সম্ভবতঃ সবচেয়ে আলোচিত থার্মোডিনামিক্সের ফর্মূলা হচ্ছে, সেকেন্ড ল' যেটা বলে যে, ঠান্ডা জিনিস থেকে গরম জিনিসের দিকে কোনদিন, কোনভাবেই তাপ যেতে পারবে না, যদি না বাইরে থেকে কিছু এনার্জি বা ওয়ার্ক সিস্টেমের ভেতরে ঢোকানো না হয় ।। যদি সেকেন্ড ল' না থাকত, তাহলে আমরা শীতল->গরম এর হিট ফ্লো ব্যবহার করে চোখ বন্ধ করে নানান কাজ করে ফেলতে পারতাম, পারপেচ্যুয়াল মেশিনের স্বপ্নটাও সত্যি হয়ে যেত ।।
প্রশ্ন হল, দ্বিতীয় সূত্রটা কি তাহলে, সূর্য পূর্ব দিকে ওঠার মত নিরস, নিরেট একটা বিষয় ? উত্তরটা যে "না" ও হতে পারে, সেটা সে---ই উনবিংশ শতাব্দীতেই মানুষ ধারণা করে ফেলেছিল ।। ১৮৬৭ সালে, জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েলের নিরীহ একটা থট এক্সপেরিমেন্ট জানিয়েছিল, "না! দ্বিতীয় সূত্রও ভুল হতে পারে ।।" তার থট এক্সপেরিমেন্টের কল্পনায় বাস করত, অসম্ভব দ্রুতগামী আর বুদ্ধিমান একটা জীব ।। সেই জীবটা বাতাসের কণাগুলিকে দেখতে পেত ।। একটা বাক্সের মধ্যে গরম বাতাস আর অন্য বাক্সে ঠান্ডা বাতাস রেখে দিলে, জীবটা পরিষ্কার দেখতে পেতে, গরম বাতাসে কণাগুলির দ্রুত গতিতে ছোটাছুটি আর ঠান্ডা বাতাসের কণার ধীরেসুস্থে চলাফেরা ।। দুই বাক্সের মাঝখানে একটা দরজা ছিল, যেটা বাইরে থেকে স্যুইচ দিয়ে খোলা-বন্ধ করা যেত ।। সেই স্যুইচটাও জীবটা চালাতে জানত ।। এখন ম্যাক্সওয়েলের এই অতি বুদ্ধিমান জীবটা ইচ্ছা করলেই দরজা খুলে দিয়ে ঠান্ডা অংশের দ্রুত গামী কণাকে গরম অংশে আর গরম অংশের অপেক্ষাকৃত ধীরগতির কণাকে ঠান্ডা অংশে পাঠিয়ে দিতে পারত ।। তাহলে গরম অংশে দ্রুতগামী কণার পরিমাণ সে বাড়িয়ে দিচ্ছিল আর ঠান্ডা অংশে ধীর-স্থির কণার সংখ্যা সে বাড়িয়ে দিচ্ছিল ।। ফলাফল? গরম অংশ আরো গরম হচ্ছে আর ঠান্ডা অংশ আরো ঠান্ডা হচ্ছে ।। স্রেফ তার জ্ঞানকে ব্যবহার করে, জীবটা একটা ভ্যাজাল বাঁধিয়ে দিয়ে থার্মোডিনামিক্সের সেকেন্ড ল'র বারোটা বাজিয়ে দিল ।।
এই জীবটার নাম দেয়া হয়েছিল, ম্যাক্সওয়েলের অশরীরি ।। নামটা বেশী খারাপ হয় নি, কারণ সে আমাদেরকে একটা গা-ছমছমে-অশৈলী সমস্যার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল ।। থার্মোডিনামিক্স একটা অসম্ভব রকমের রোবাস্ট থিওরী ।। বিংশ শতাব্দীতে অনেক রথী-মহারথী সূত্র কোয়ান্টাম থিওরী আর রিলেটিভিটির ঝড়ে উড়ে গিয়েছিল ।। কিন্তু, এই ব্লিজার্ডের মুখোমুখি হয়েও, হিমালয়ের মতন মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ছিল, তাপগতিবিদ্যা ।। কিনতু উনবিংশ শতাব্দীর কাল্পনিক এই অশরীরি যুগ যুগ ধরে, থার্মোডিনামিক্সের কাছে যে ব্যাখ্যা দাবী করে চলেছে, তার দিতে তাপগতিবিদ্যা ব্যরথ হয়েছে ।। কি সেই, মহার্ঘ্য বসতু/ব্যাখ্যা, যার কাছে অটল, অক্ষয় তাপগতিবিদ্যাও নতজানু হয়ে পড়েছে ।।
(উত্তর আগামী পর্বে)
[নিউ সায়েন্টিস্ট পত্রিকার চৌদ্দই মে দু'হাজার ষোল এডিশনের "ম্যাটার, এনার্জী ... নলেজ : হাউ টু হার্নেস ফিজিক্স'স ডেমনিক পাওয়ার আর্টিকেলের ভাবানুবাদ]
No comments:
Post a Comment