আজ রবিবার ...
তাও ঘুমদেবীকে বিদায় জানাতে হল সাতসকালে - ঠিক পৌনে সাতটায় ...
সোয়া নয়টার বাসটা ধরতে না পারলে, পঁয়ত্রিশ কিলোমিটার দূরের ক্লেম হিলে যেতে দুপুরটা পার হয়ে যাবে ... এসিটি গভমেন্টের সাবসিডাইজড অ্যাকশন-বাসের ফ্রিকোয়েন্সী উইকএন্ডে বিশ্রী রকম কমে যায় ... অন্যদিন যেখানে, বাস-স্টপে দাঁড়ালেই পনের মিনিট থেকে আধঘন্টার ভেতর একটা বাসের দেখা মেলে, শনি রবিবারে রীতিমত রাউটিং-অ্যালগরিদম সলভ করে বাসা থেকে বের হতে হয়, কয়টার বাস ধরলে, পরের বাসটা কত মিনিট পরে পাওয়া যাবে, ইত্যাদি ইত্যাদি ... আনাড়িদের জন্য গুগল ম্যাপস ভরসা আর একটু অভিজ্ঞদের জন্য এসিটি সরকার বাহাদুরের ওয়েবসাইটে নানান রুটের বাসের ম্যাপ দেয়া আছে ...
আমাদের বাসস্টপটা বাসা থেকে মিনিট খানেকের হাঁটা পথ - সাবার্বের লোকেদের নিত্য-প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনাকাটা করার জন্য শপসের উলটো দিকে ... অর্ধচন্দ্রাকৃতি সিলিন্ডৃকাল শেপের বসার জায়গাটার ভেতরটা সবসময় ধূমপায়ীদের ধোঁয়া, সিগারেটের টুকরা, জুসের ক্যানের বিন হিসেবে ব্যবহার করায় আর ময়লা হয়ে থাকায়, আমরা বাসের জন্য অপেক্ষা করতে গেলে সাধারনতঃ ফুটপাথ ঘেঁষে বসানো কাঠের নিচু রেলিংটাই পছন্দ করি... শীতের মৌসুম শেষ হয়ে যাওয়ায় ক্যানবেরার আবহাওয়া বেশ গরম হয়ে উঠছে, কিন্তু ওয়াটসন এলাকায় গাছপালার কল্যাণে, ঝিরিঝিরি বাতাস সেটা অনেকটা প্রশমিত করে রাখছে ...
ওয়াটসন থেকে বাসে উঠে ক্যানবেরা সেন্টারে নেমে, সিটি বাস স্টপ থেকে টাগেরানঙ পর্যন্ত দী---র্ঘ বাস জার্নী করে আর টাগেরানঙ থেকে ক্ষুদ্র বাস যাত্রা করে যখন জিম-পাইক আর ক্লেমহিল স্ট্রিটের সংযোগস্থলে বাস থেকে নামলাম, ধক করে আগুনের হল্কা চোখে মুখে ছুটে আসল ... মধ্যাহ্ণের বসন্তের সুর্য নর্থ ক্যানবেরার (বড়)গাছপালাহীন উষর প্রান্তরে বেড়াতে আসা ভিজিটরদের একটু ভাল করে পরখ করে নিল আর কী! ... সূর্য মামাকে একটু অনার করে গায়ে চড়ে থাকা হালকা গরম কাপড় গুলো ব্যাগে চালান করে দিয়ে, আমরা আপহিল হাঁটা ধরলাম ...
অস্ট্রালিয়ায় আমাদের জীবনযাত্রার নিউক্লিয়াস খালা-খালুর ক্লেমহিলের বাসায় পৌঁছতে একটা ক্ষুদে টিলা ডিঙানো লাগে ... বাস স্টপ থেকে সুন্দর পায়ে চলা পাকা পথ উঠে গেছে সবুজ ঘাসের ভেতর দিয়ে তিনটে ক্যাঙারুর স্কালপচারের পাশ দিয়ে ... সবুজ ঘাসের গালিচা এখন হলদে তারার ফুলে ছাওয়া ... জায়গাটা ঠিক বনতল না হলেও, "বনতল ফুলে ফুলে ঢাকা" গাইতে কোন মানা নেই ...
প্রচন্ড তাতানো গরমে মিনিট খানেক ওপরপানে হাঁটলে অবশেষে খালুর নিজ হাতে ডিজাইন করা সুপরিসর তেতলা কাঠের বাড়ির দেখা মিললো ... মাথায় রেডরাইডিংহুড পরা খালা হাস্যোজ্জ্বল অভ্যর্থনা জানিয়ে বললেন, তারা শীতের বিদায় উপলক্ষ্যে অন্দরমহলের গাছপালার যত্ন নিচ্ছেন ... ওপরে উঠে দেখি, দোতলার খোলা বারান্দায় সার, মাটি আর গাছপালা নিয়ে খালু মহা ব্যস্ত ... সেই বারান্দাতেই ভর দুপুরে ম্যারিনেটেড ল্যাম্ব, চিকেন, রোস্টেড মিষ্টিকুমড়া, মাশরুম আর পেঁয়াজ দিয়ে খালু ঝটপট বারবিকিউ লাঞ্চের ব্যবস্থা করে ফেললেন ... আল্লাহ বড়ই মহান ... অসাধারণ সুস্বাদু খাবার আমাদের রিযিকে রেখেছিলেন আজকের ছুটির দুপুরে ...
অন্দর মহলের কিচেনটপে রাজসিক লাঞ্চ সেরে যখন খালা-খালু, অনুজ ভ্রাতৃদ্বয়, মাতুল, সহধর্মিনী আর শিশুপুত্র এক এক করে সবাই উঠে গেল, আমি তখনো বিশাল এক খন্ড ছাগ-মাংস দিয়ে তরিবৎ করে রসনা নিবৃত্ত করছি ... লাঞ্চ টেবিলের শেষ ব্যক্তি হিসেবে আমি যখন উঠে দাঁড়ালাম তখন দু'টুকরো গ্রিলড মিষ্টিকুমড়া আমাদের রসনাবিলাসের সাক্ষী হয়ে বসে আছে ...
দুপুর গড়িয়ে, বিকেল পেরিয়ে যখন নর্থ ক্যানবেরার উষর পাহাড়ের ওপর বসন্তের সূর্য মায়াময় রোদ ফেলতে শুরু করলো, তখন প্রায় দু'ঘন্টার আড্ডার যবনিকা টেনে আমরা উঠে দাঁড়ালাম ... এবার যে নীড়ে ফেরা লাগে ... নীড় তো খুব কাছে না, তিনটে বাসে প্রায় পঁয়ত্রিশ কিলোমিটার দূরের পথ ... ঝটপট সান্ধ্যকালীন প্রার্থনা সেরে সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে খালুর ফোর-হুইলারে চেপে বসলাম, মিনিট বারো দূরের টাগেরানঙ বাস স্টেশনে লিফট নেয়ার আশে ...
নয়শ নম্বর বাসের একমাত্র যাত্রী হিসেবে আমরা তিনজন যখন উঠলাম, তখন দ্বীপ-মহাদেশের রাজধানীতে আঁধার পুরোপুরি নেমে গেছে ... আলো-আঁধারির ভেতর দিয়ে জনবিরল শহরের আরো জনশূন্য নির্জনতা দেখতে দেখতে ভাবছিলাম, ভয়ের গল্প জন্ম নেয়ার জন্য এতো পারফেক্ট পরিবেশ ... কিন্তু, ভারতীয় স্বল্পচুলাবৃত ড্রাইভারের নির্লিপ্ত বাস চালনায় নিরুদ্বেগেই আমরা পৌঁছে গেলাম, য়োডেন টাউনসেন্টার পেরিয়ে কিঞ্চিত আলো ঝলমলে কিন্তু, একই রকম জনশূন্য শহরকেন্দ্র, সিটিসেন্টার বাসস্টপে ... তারপর, ভারতীয় সুদর্শনা ড্রাইভ্রেস (ড্রাইভারের স্ত্রী লিঙ্গ আর কী!) এর নরম হাতে ধরা স্টিয়ারিং-হুইলে নিজেদের সঁপে দিয়ে রাতের ক্যানবেরার প্রায়ান্ধকার হাইওয়ে ধরে দু'বার পথ ভুল করে ঘুটঘুটে অন্ধকারে মাত্র গোটা কয়েক হলদে স্ট্রীট ল্যাম্প আর আকাশ ভরা তারা, মেঘ আর এক খন্ড বাঁকা চাঁদের ওপর ভরসা করে যখন আমাদের অতিচেনা আর অতিপ্রিয় নক্সস্ট্রীটের মোড়ের লালচে ইঁটের চতুর্তলা বাড়ির নিচতলার দরজায় চাবি ঘুরিয়ে মোচড় দিলাম, মনে হল - বাহ এর চেয়ে ভালো উইকএন্ড কী দিনের শুরুতে আশা করে ঘর থেকে বেরিয়েছিলাম!
2 comments:
Good One!
Thanks Asef!
Post a Comment